ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬,

শ্রম কেনা-বেচার হাট

| নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিসেম্বর ১০, ২০২৫, ১০:৫৮ পিএম

শ্রম কেনা-বেচার হাট

প্রাচীন ও মধ্যযুগে সমাজে মানুষ কেনা-বেচা করা হত। তখন দাস প্রথার প্রচলন ছিল। কিন্তু সেই দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু বর্তমানে চারদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। দেশে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হচ্ছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু এত আধুনিকতার মাঝেও ক্ষুদা আর দারিদ্রের আঘাতে পিষ্ট হয়ে নিন্ম আয়ের মানুষ গুলো দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য আজও নিজেদের বেঁচে দিতে হয় এ হাটে।

প্রতিদিন সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা এলাকার ঢাকা সিলেট মহা-সড়কের পাশে বসে মানুষ কেনা-বেচার হাঁট। এ হাঁটে রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, সেনেটারি মিস্ত্রি, দিনমজুরসহ নানা পেশার মানুষের ভীড়ে জমজমাট হয়ে পড়ে এ হাঁটটি। এ হাটে তারা নিজেদের সারাদিনের জন্য শ্রম বিক্রি করেন ৫’শ থেকে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে। এ হাঁটে অনেকে বিক্রি হলেও আবার অনেকেই অবিক্রিত থেকে যায়। যেদিন তাদের কেউ কেনে না সেদিন তাদেরকে অন্য কোন কাজের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়তে হয়। এভাবেই চলতে থাকে তাদের জীবন সংগ্রাম।

জানা যায়, রূপগঞ্জ উপজেলাটি ঢাকার খুব কাছে হওয়াতে দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন কাজের সন্ধানে ভীড় জমায় এখানে। যারা কলকারখানায় কাজ না পেয়ে তাদের অনেককেই এক প্রকার বাধ্য হয়ে দিনমজুরের কাজ করতে হয়। তাইতো প্রতিদিন তারা নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে চলে আসে এ হাটে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত চলে এ হাঁট। এ বাজারে শ্রমিকের শ্রম কিনতে আসেন মালিকরা। উপজেলার কাঞ্চন এলাকা থেকে সাগর মিয়া জানান, পরিবারের অবস্থা ভাল না থাকায় লেখা-পড়া করতে পারেননি। স্ত্রী সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর জন্য নিজেকে প্রতিদিন বিক্রি করতে আসেন মানুষের হাটে।
কোনো দিন ৫’শ আবার কোনো দিন ১ হাজার টাকায় বিক্রি শ্রম বিক্রি করেন তিনি। আবার ভাগ্যের পরিহাসে কোনো কোনো দিন থেকে যান অবিক্রিত। যেদিন অবিক্রিত থেকে যান সেদিন সংসারের খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে।

নিজেকে বিক্রি করতে আসা আমান মিয়া নামে (৬৫) আরেক দিনমজুর জানান, প্রতিদিন সকালেই তাকে বেড়িয়ে পড়েন নিজেকে বিক্রি করতে। এ হাঁটে মালিকরা এসে তাদেরকে ৫’শ থেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যায়। কেউ একদিনের জন্য বিক্রি হয় কেউবা আবার ৪-৫ দিনের জন্য বিক্রি হয়ে থাকে এখানে। আবার কখনো কখনো তিনি অবিক্রিত থাকে যান। তখন তাকে আবার ছুটতে অন্য কাজের সন্ধানে। তিনি আরো জানান, কাজ জোগাড় না করতে পারলে সংসার চলবে না। তার দিকে তাকিয়ে থাকে পরিবারের আরো ৬ টি মুখ। যাদের মুখে খাবার তুলে দিতে তাকে বৃদ্ধ বয়সে আজও কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

আতিক নামে আরে শ্রমিক জানান, এখন ধান টাকার মৌসুম। চারদিকের মাঠঘাট সোনালী ধানে ভরে গেছে। তাই এখন কাজের দামও বেশ ভাল পাওয়া যায়। তবে, ধানকাটার মৌসুম চলে গেলে তাদের কাজ একটু কমে যায় তখন তাদের তাদের সংসারের টানাপড়েন বহুগুনে বেড়ে যায়। কাজ না পেলে কখনো কখনো পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়েই থাকতে হয় তাকে।

উপজেলার ভোলাবো এলাকা থেকে শ্রমিক কিনতে আসা সবুর মিয়া জানান, তিনি ৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। মাঠে ধান পেকে যাওয়ায় তিনি শ্রমিকের শ্রন কিনতে এসেছেন। এখানে সকাল ভোর থেকে বেলা ৯ টা পর্যন্ত মানুষের হাঁট কেনা-বেচার হাট থাকে। তিনি দাম-দর করে ধান কাটার জন্য ৫ দিনের জন্য দিনমজুর কিনতে এসেছেন। এ হাঁটে শ্রমিক কিনতে হলে প্রতিদিনের জন্য তাদেরকে গুনতে হয় ৫’ শ থেকে ১ হাজার টাকা। এদিকে ধানের দাম কমে যাওয়ায় তাদের মতো কৃষকদের পড়তে হচ্ছে বিপাকে। শ্রমিকের মজুরী দিয়ে ধান চাষ করে তাদের লোকসানের সম্মূখীন হতে হচ্ছে।

Link copied!