ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬,

নির্বাসিতের প্রত্যাবর্তনে এবার হাসুক বাংলাদেশ

পরিবর্তনের ডাক | এস এম সাব্বির খান

ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫, ০৪:৫২ পিএম

নির্বাসিতের প্রত্যাবর্তনে এবার হাসুক বাংলাদেশ

ঢাকা : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বন্ধুর পথ ধরে যেমন ঐতিহাসিক অর্জনের সোনালি কাবিন রচিত হয়েছে। আবার সেই ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার মতো অনাকাঙ্খিত ঘটনায় রচিত হয়েছে রক্তিম লালসালুও। প্রজন্মের দামাল প্রাণের আহুতি আর বিপ্লবীদের রুধিরাগ্নিতে ক্ষমতাসুরের সাম্রাজ্য ভস্মীভূত হয়েছে যতবার। ততোবার আশাহতের আশা হয়ে এসেছে কেউ না কেউ। শুধু আসেনি বাঙালি জাতিসত্তার কোনো কাণ্ডারির হাত ধরে কোটি বাংলাদেশীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লগ্ন।

খুদি থেকে হাদী; জঠরের লাখো সন্তান বিসর্জন দেওয়া হয়ে গেছে। লাশের স্তূপ জমে বধ্যভূমি আর গণকবরে ঢেকে গেছে গোটা মানচিত্র। পতাকার বুক ভারি হয়ে গেছে রক্তা জমাট লাল বৃত্তে। আথচ আজো পূরণ হয়নি এদেশের কোটি মজলুমের একটু শান্তিতে বেচে থাকার আকুতি। 

এদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বাক বদলের ঐতিহাসিক প্রতিটি প্রেক্ষাপটের মতো বিস্ময়করভাবে এবারও রচিত হলো এক নির্বাসিত রাজনৈতিক নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের গল্প। পটভূমি ভিন্ন হলেও প্রত্যাবর্তনের প্রতিটি গল্পের সূচনায় অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে প্রত্যাশা এটুকুই, এবার দুঃস্বপ্নের বেসাত ভাঙুক। কোটি জনতার স্বপ্ন নয়। কেন এমন আকাঙ্খা আর আশঙ্কার দোলাচাল? তার উত্তর খোজা যাক তবে।

বাংলাদেশের বুকে এ যাবত গণমানুষের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা আর হৃদয় নিঙড়ানো ভালোবাসার রথে চড়ে তিনজন রাজনৈতিক নেতার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের ঘটনা ঘটলো। যার প্রথমটির সময়কাল ছিল ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সাল। শোষকের কারাগার থেকে মুক্ত স্বদেশের বুকে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম আর মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ফিরে আসা। রাজনৈতিক মতভেদ আর মূল্যায়ণ, আদর্শিক দ্বন্দ্বতত্ত্ব, ৭১ প্রজন্মের বিবৃতি, দেশীয় বা দলীয় দর্শণ আর বিবরণ- বর্তমানে দাঁড়িয়ে নুন্যতম বিতর্কের জের টানা যায় এমন সব তত্ত্ব এক।পাশে ঠেলে দিলেও, বিশ্বমানবতার বিপ্লবী মহানায়ক ফিদেল।কাস্ত্রো,  মানবতাবাদী রাজনেতা ব্রোকওয়ে, পশ্চিমা প্রভুত্ববাদ বিরোধী  বিদ্রোহী ইয়াসির আরাফাত,  শান্তিকামী উইলিবার্ট অথবা আরবের মরুসিংহ অদম্য মুজাহিদ সাদ্দাম হোসেনের মতো কিংবদন্তী বিশ্বনেতাদের মূল্যায়ণ অবধারিতভাবে এসত্য বয়ান করে যে স্বাধীন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিল বাঙালি ও বিশ্বমানবতার তরে মজলুমের নেতা।। শুধু তাই নয় রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিপীড়িত গাজাবাসী আর যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামের স্বাধীনতার সমর্থনে যুদ্ধবাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধো যুদ্ধে  প্রকাশ্যে সামরিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া বিশ্বের একমাত্র মুসলমান রাষ্ট্রনায়কও যা খামিনি, এরদোয়ান, সালমান, সরফরাজরাও আয়াহস করেনি কোনোদিন।

নিজ দেশে এই মহান নেতার প্রত্যাবর্তন লগ্নে হাসি-কান্না মাখা গণমানুষের উচ্ছ্বসিত উদযাপনের ঘটনা অদ্যবধি নজিরবিহীন। কিন্তু সরকার প্রধান হিসেবে ব্যর্থতা, আধিপত্যবাদী মানসিকতা, বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গণতন্ত্র বিনাশের অভিযোগ আর ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনৈতিক পটভূমিতে এক বিতর্কিত রাজনেতা হিসেবে নৃশংস রাজনৈতিক  হত্যাকাণ্ডে তার সমাপ্তি ঘটে। যার রহস্য আজো ধোয়াটে। যার কারণে প্রত্যাশার বাংলাদেশ আর পায়নি জনগণ।  

বিপ্লবী দর্শণের বৈশ্বিক মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের নির্বাসন প্রথাগত না হলেও তার প্রত্যাবর্তন এক ঐতিহাসিক ঘটনার রাজসাক্ষী। পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার শেখ মুজিবকে নিয়ে বর্তমানে অনেকে স্যুটকেস-ব্রিফকেসের গল্প শোনান। ঠিক যেভাবে নিরবাসিত বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে নিয়ে চটুল সমালোচনা করেন কিছু কথিত সুশীল আর রাজনৈতিক বোদ্ধা। যা আগামীর জন্য লক্ষণীয়।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার ঘটনার জেরে শেখ হাসিনাকে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। স্বৈরাচার এরশাদ সরকার বিরোধী রক্তিম বিপ্লবের পটভুমিতে ঘটে এদেশের ইতিহাসে আলোচিত কোনো রাজনেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দ্বিতীয় ঘটনা। ১৯৮১ সালে লাখো জনতার উচ্ছ্বসিত অভিবাদনে তিনি দেশের মাটিতে ফিরে আসেন শেখের বেটি হাসিনা হয়ে। মুক্তির মহানায়কের এই উত্তররসূরিকে  সেদিন এদেশের মানুষ স্বাগত জানিয়েছিল স্বৈরাসুরের হাত থেকে মুক্তির সংগ্রামে লড়তে থাকা আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার৷ আদর্শ সহযোদশা হিসেবে।

শেখ হাসিনার সেই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বহুদলীয় রাজনৈতিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং তা রক্ষায় আপোষহীন সংগ্রামী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে দেখা হয় ’৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পটভূমিতে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পুনর্জাগরণ হিসেবে। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি এদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক মুক্তির ঐতিহাসিক সংগ্রামের সারথী হিসেবে পরিচিতি পান। অথচ সেই খালেদা জিয়াকেই কারারুদ্ধ করে, অপরাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাবাদের নজির প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

স্বল্পকালীন গণতান্ত্রিক যাত্রার পর ১/১১-এর পটভূমিতে আসে বড় বিচ্যুতি। ক্ষমতার লিপ্সা ভুলিয়ে দেয় রাজপথের সহযোদ্ধাকে। তবে সেখানে গুপ্ত গোষ্ঠির ষড়যন্ত্রের তত্থ্যও আছে। যারা এই জুটু ভাঙতে চেয়েছিল। সে সময় সেনা সমর্থিত শোষক বিরাজনীতিকরণের কৌশল বাস্তবায়ণে মত্ত হয়। ধূর্ত শোষকেরা তখন ঠিকু এদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র চিনতে পেরেছিলেন। আর সেজন্যই দেশ ছাড়া করা হয় তারেক রহমাকে।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনে বিশ্বস্ত সন্তানকে বাচাতে এক মা হিসেবে সেদিন গণতন্ত্রের বেগম গোলামের কাছে নত হন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়েন তারেক রহমান।

সময়ের ফের ঘুরে সেই লিপ্সায় গড়ে তোলা ফ্যাসিবাদী সাম্রাজ্যের পতনে ইতি ঘটনে হাসিনা সরকারের। একদিন যাকে এদেশের মানুষ বুকে টেনে নিয়েছিল এদিন কর্মদায়ে তারাই তাকে নির্বাসিত করে। জনতার রক্তে কলঙ্কিত ইতিহাস রচনা করে দেশ ছাড়েন হাসিনা।

আবারো এক্কটি রক্তাক্ত বিপ্লোবের মধ্যদিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পটভূমিতে এবার নির্বাসিত জীবন শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটলো তারেক রহমানের। লাখো জনতা আর দলীয় নেতাকর্মীর নয়ন।মণি হয়ে তিনি এলেন, কথা বললেন, কান্নায় বুক ভাসিয়ে আনন্দের বানে কষ্ট জলাঞ্জলী দিলো মজলুমের বাংলাদেশ তারেক রহমান একজন বুদ্ধিদীপ্ত রাজনীতিবিদ বলেই বিদেশে বসেও ঠিকই নিজের দলকে অস্তিত্বহানী থেলে রক্ষা করতে পেরেছেন। তার প্রজ্ঞা  বা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। শুধুধু এদেশের মেহনোতি মানুষের পক্ষ থেকে বলবো, বার বার বিশ্বাস ভাঙার পরেও একজন তারেক রহমানকে তারা আস্থায় ধারণ করেছে। হিমরাত্রির কাপুনি, ক্ষুধা আর নির্ঘুম চোখের জ্বালা উপেক্ষা করে তারা অধির অপেক্ষায় বসেছিল যে মুখটুকু দেখবে বলে, সেই মুখ যেন হয় ১৮ কোটি মানুষের প্রতিচ্ছবি। দলের নেতা হবেন না দেশের- সেই সিদ্ধান্ত আপনার। আমরা দিল্লি-পিণ্ডি নিয়ে মগজ ধোলাই চাই না। ভূরাজনীতির বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের একজন সুযোগ্য প্রতিনিধি চাই। মব দিয়ে না মন দিয়ে দেশ সামাল দেওয়া চাই। এমন একটা দেশ আপনাকে দিতে হবে যেখণে হাদীর মৃত্যুতে তার সন্তান আফসোস করবে না গর্বিত হবে। ইতিহাস যেন বলে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫- পূর্বাচলে নতুন সূর্যোদয় হয়েছিল। এরপর আর আধারে হারায়নি বাংলাদেশ।

 লেখক : সাংবাদিক

পরিবর্তনের ডাক

Link copied!