ঢাকা সোমবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪৩২

আজম খানের ‘উচ্চারণ’ ফিরছে নতুন আবেগে

পরিবর্তনের ডাক | বিনোদন প্রতিবেদক

নভেম্বর ১৪, ২০২৫, ০৬:০২ পিএম

আজম খানের ‘উচ্চারণ’ ফিরছে নতুন আবেগে

ঢাকা : ‘পপসম্রাটের’ প্রয়াণের পর থমকে গিয়েছিল ‘উচ্চারণ’। চৌদ্দ বছর পর আবারও অনুশীলনের ঘরে বাজছে ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের সুর।

আজম খানের সেই রক-স্পিরিট যেন ফিরে এসেছে পুরোনো সঙ্গীদের হাতে। দুলাল জোহা, পিয়ারু খান, পার্থ মজুমদারসহ একদল অভিজ্ঞ সংগীতশিল্পী আবারও এক হয়েছেন ‘উচ্চারণকে’ নতুনভাবে মঞ্চে আনতে।

‘গুরুর’র গানগুলো যেন নিখুঁত হয়ে উঠে, সেজন্য তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে তাদের অনুশীলন। খুব শিগগিরই দেশ-বিদেশ ও টেলিভিশনের মঞ্চে পাওয়া যাবে আজম খানের ‘উচ্চারণকে’।

‘উচ্চারণ’ নিয়ে দর্শকের সামনে পারফর্ম করার প্রস্তুতি চলছে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে। ছয় সদস্যের এই দল প্রায় ১৫টি গান প্রস্তুতও করেছেন।

‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের নতুন লাইনআপে রয়েছেন দুলাল জোহা (ভোকাল ও রিদম গিটার), পিয়ারু খান (ভোকাল ও পারকেশান), সেকান্দার আহমেদ খোকা (বেজ গিটার), পার্থ মজুমদার (লিড গিটার), প্রেম (কিবোর্ড) এবং বাপ্পী (ড্রামস)।

এই ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই আজম খানের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন। তাদের সঙ্গে গ্লিটজের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে ‘উচ্চারণের’ ফেরা নিয়ে উচ্ছ্বাস, প্রত্যাশা, আজম খানের সময়ের গল্প।

গায়ক দুলাল জোহার ভাষ্য, “আমরা তো পুরনো মিউজিশিয়ান, সবাই পারফেকশন খুঁজি।”

নতুন ‘উচ্চারণের’ লিড গিটারিস্ট পার্থ মজুমদারের বলছেন, “শুরুও তো ওইখান থেকেই, জীবনের শেষ সময়ে আবার উচ্চারণে ফিরছি এটা আনন্দের।”

পরিবারের তত্ত্বাবধানেই নতুন আয়োজনে আজম খানের গানগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন তার মেয়ে অরণী খান।

ব্যস্ততা অনুশীলনে

‘উচ্চারণ’ ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো, সেই প্রশ্নে ব্যান্ডের ভোকাল দুলাল জোহা গ্লিটজকে বলেন, “আজম খানের গানের প্রতি মানুষের উন্মাদনা এখনো অনেক। একদিন পিয়ারু খানের সঙ্গে ‘উচ্চারণ’ মঞ্চে ফিরিয়ে আনা যায় কি না সেটা নিয়ে কথা বললাম। পিয়ারুও বলল, 'চলো দোস্ত আমরা শুরু করি'। তারপর পার্থ মজুমদারের সঙ্গে কথা বললাম। সেকান্দার আহমেদ খোকার সঙ্গে কথা বলে আমরা সিনিয়র মিউজিশিয়ানরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।

“একজন বাদে আমরা সবাই আজম ভাইয়ের সঙ্গে বাজিয়েছি। আমাদের অনুশীলন চলছে। এসবের মধ্যে প্রধান যে ভূমিকা রাখছে, তিনি হল পার্থ মজুমদার। সে সব কিছু গোছাচ্ছে। একটা গান তিন থেকে চারদিন অনুশীলন হচ্ছে, আজম ভাইয়ের গানগুলো আরও কীভাবে সুন্দর আয়োজনে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যায় সেই চেষ্টাই চলছে আমাদের।"

ছোট থেকেই আজম খানের সঙ্গে সখ্যতা ছিল দুলাল জোহার। মতিঝিলের একই কলোনিতে থাকতেন তারা।

এত বছর পরে গানগুলো করার অনুভূতি কেমন প্রশ্নে এই শিল্পী বলেন, “আবেগ, অনুভূতি তো অনেক, আমি ৪০ বছরের উপরে আজম ভাইকে লালন করে যাচ্ছি। আমি আজম ভাইকে ছোট থেকেই চিনি। গান করলে আজম ভাইয়ের গানই করতাম, সবসময়। গানগুলো যখন গাই তখন মনে হয় আজম ভাই আমার সঙ্গেই আছেন। এই অনুভূতিটা ভেতর থেকে আসে। অনুশীলনে গানগুলো যখন করি সবাই মিলে খুব উপভোগ করি।

দুলাল জোহা ও পিয়ারু খান 'উচ্চারণ' ব্যান্ডে যুক্ত হন পঁচাত্তরের শেষের দিকে। যখন আজম খান 'উচ্চারণ' পুনর্গঠনের জন্য তরুণ রকার ফোয়াদ নাসের, ড্রামার পিয়ারু খান ও রিদম গিটারিস্ট দুলাল জোহার উপর আস্থা রেখেছিলেন। সে সময় তিনটা গিটার, ড্রামস, আর একজন ভোকাল মিলেই চলছিল ব্যান্ডের কার্যক্রম।

আজম খানের সঙ্গে কাটানো সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে জোহা বলেন, “আমি ছোট বেলা থেকেই আজম ভাইকে চিনি। মতিঝিল কলোনিতে আজম ভাইয়ের বাসার বিপরীতে ছিল আমার বাসা। উনার ভক্ত ছিলাম, যখন ব্যান্ড ভেঙে যায় দ্বিতীয় দফায় তৈরির সময় আমি যুক্ত হই। আজম ভাই আমার কাঁধে গিটার দেখে বলেছিল, ‘কী রে তুই গিটার বাজাস? যা নয়নরে ডাইকা আন (নয়ন মুন্সি)’। আমি নয়ন, পিয়ারু, বাবু মিলে তখন উচ্চারণে বাজাই।”

স্মৃতি স্মরণ করে আরও বলেন, “আজম ভাই কখনো হাতে খাতা কলমে গান লিখতেন না। এসে বলতেন এই দুলাল গানটা ধর তো।”

‘জীবনের শেষ সময়ে সেখানে ফিরছি, এটা আনন্দের’

দীর্ঘসময় পর ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের কার্যক্রমে প্রস্তুতি কেমন চলছে প্রশ্নে দলের লিড গিটারিস্ট পার্থ মজুমদার বলেন, "আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি, আমাদের শুরু তো ওইখান থেকেই, জীবনের শেষ সময়ে আবার উচ্চারণে ফিরছি এটা আনন্দের।

“আমরা কেমন করে যেন সেই প্রাথমিক স্টেজেই ফিরে এসেছি। ঘুরেফিরে মনে হচ্ছে আগের ‘উচ্চারণ’, শুধু আজম ভাই নেই। ভাইয়ের গানের সেই আবেগ, ভালোবাসা থেকেই কাজটা করা। গানগুলোর মূল যে মিউজিক, সিগনেচার ধারা সেটা রেখে একটু আধুনিকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি।"

‘মিউজিক ধরে রাখার’ পরামর্শ দিতেন জানিয়ে পার্থ মজুমদার বলেন, “আজম খান দেখা হলেই বলতেন, 'পার্থ ধইরা রাখিস কিন্তু, ছাড়িস না'। মিউজিকটা যেন ধরে রাখি সেই কথা বলতেন। আজম ভাইয়ের সঙ্গে যারা ছিলেন তারাও আমাদেরকে সহযোগিতা করছেন। আমরা ভীষণ আশাবাদী।”

সম্প্রতি আজম খানের পরিবারের পক্ষে তার কন্যা অরণী খান, ব্যান্ডের দলনেতা দুলাল জোহাসহ সব সদস্য, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার শোভন, ব্যবস্থাপক এজাজ রহমান এবং কুল এক্সপোজারের পক্ষে প্রধান নির্বাহী এরশাদুল হক টিংকু একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

চুক্তি নিয়ে গ্লিটজকে এরশাদুল হক টিংকু বলেন, "যেহেতু ‘উচ্চারণ’ নতুনভাবে ফিরছে কোনো প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করারও একটা বিষয় রয়েছে। আমরা সেই দায়িত্ব নিয়েছি। ‘উচ্চারণ’ কীভাবে সামনে এগোবে, দেশে ও বিদেশের কনসার্ট, টেলিভিশনে অনুষ্ঠান, পরিবারের রয়্যালটি পাওয়া সবকিছু নিয়েই আমাদের কাজ চলছে।

“আগামী বছরের মে মাসে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রে কনসার্টের কথা চলছে। টেলিভিশনে প্রোগামের কথা চলছে, দেশে ডিসেম্বরে কনসার্টের পরিকল্পনা হচ্ছে। ‘উচ্চারণ’ এগিয়ে নিতে যতটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন, আমরা সেটা করছি।"

আজম খানের মেয়ে অরণী খান বলেন, “আমাদের তত্ত্বাবধানেই 'উচ্চারণ' ফিরছে। পরিবারের সদস্যদের সব সময় চাওয়া ছিল, আব্বুর গানগুলো সবার মাঝে বেঁচে থাকুক। গানগুলো নতুনভাবে ফিরছে, কনসার্টে দর্শক শুনতে পারবে, আমরাও বেশ আগ্রহী।”

যে সময়ে ব্যান্ড সংগীতকে বলা হত ‘অপসংস্কৃতি’, সে সময় স্রেফ ‘জেদের বশে’ পাড়ায় পাড়ায় বন্ধুবান্ধব নিয়ে বাঁশ দিয়ে ঘিরে মঞ্চ বানিয়ে গান গাইতেন আজম খান।

একবার এক সাক্ষাৎকারে আজম খান বলেছিলেন, ‘বন্ধুবান্ধবরা আমার গান ভালো বললেও, আমি আসলে গায়ক না, সিরিয়াসও ছিলাম না’।

গান নিয়ে উদাসীন সেই মানুষটিই পরে বন্ধু নীলু, মনসুরের গিটার আর সাদেকের ড্রামসের সঙ্গে, ‘সিরিয়াস’ হয়ে ১৯৭২ সালে তৈরি করেন ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে শুরু হয় পপ মিউজিকের যাত্রা।

প্রথমবার মঞ্চে উঠে ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড পরিবেশন করেছিলেন নিজেদের সম্বল চারটি মাত্র গান। এরপর ধীরে ধীরে আজম খান এবং তার গানের পরিচিতি বাড়ে। ১৯৭২ সালের শেষ দিকে ‘সালেকা মালেকা’ আর 'হাই কোর্টের মাজারে' গান দুটি দিয়েই নিজেদের প্রথম রেকর্ড বের করেন।

আজিমপুরে ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম আজম খানের। তার পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। ২০১১ সালের ৫ জুন ক্যান্সারের কাছে হার মেনে অনন্তলোকে পাড়ি দেন এই তারকা।

তার কণ্ঠে ‘আলাল দুলাল’, ‘যে মেয়ে চোখে দেখে না’, ‘প্রেম চিরদিন দূরে দূরে এক হয়ে থাক না’, ‘আমার বঁধুয়া কী গাইতে জানে গান’ এমন সব গান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

আজম খানের কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া আরও কিছু গান হল ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’, ‘চার কলেমা সাক্ষী দেবে’ ‘আসি আসি বলে তুমি আর এলে না’, ‘হারিয়ে গেছে খুঁজে পাব না’, ‘অভিমানী’, ‘অনামিকা’, ‘পাপড়ি’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ও চাঁদ সুন্দর’।

এমটিআই

পরিবর্তনের ডাক

Link copied!