ঢাকা : দেশজুড়ে নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার নতুন করে জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ তৈরি করছে। গত ২৫ বছরে দেশের মোট ৩৫টি জেলায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, ২০০১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৭ জন, এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ২৪৯ জন।
সম্প্রতি আইইডিসিআর মিলনায়তনে আয়োজিত ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বজুড়ে নিপাহ ভাইরাসে গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ হলেও গত দুই বছরে দেশে শনাক্ত হওয়া সব রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে নিপাহ ভাইরাসে পাঁচজন এবং ২০২৫ সালে চারজনের মৃত্যু হয়, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করছে।
আইইডিসিআরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা সভায় বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের মৌসুম হিসেবে ধরা হলেও ২০২৫ সালের আগস্ট মাসেও রোগী শনাক্ত হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, খেজুরের কাঁচা রসের বাইরেও সংক্রমণের নতুন উৎস থাকতে পারে। গত বছর প্রথমবারের মতো ভোলায় নিপাহ রোগী পাওয়া গেছে, যেখানে আগে কখনো এই ভাইরাসের অস্তিত্ব ধরা পড়েনি।
তিনি জানান, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী—এই চার জেলায় চারজন নিপাহ রোগী শনাক্ত হন এবং প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়। নওগাঁর ৮ বছরের এক শিশুর ক্ষেত্রে আগস্ট মাসে সংক্রমণ ধরা পড়ে, যা দেশে প্রথম ‘অ-মৌসুমি নিপাহ কেস’ হিসেবে চিহ্নিত। ওই শিশুর সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস ছিল বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল, যেমন কালোজাম, খেজুর ও আম—যা নিপাহ সংক্রমণের নতুন ও উদ্বেগজনক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, খেজুরের রসের মাধ্যমে সংক্রমণের ক্ষেত্রে ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ২ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত হতে পারে। আর মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই সময়কাল সাধারণত ৯ থেকে ১১ দিন। এ কারণে খেজুরের রস খাওয়ার পর কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অন্তত ২৮ দিন আইসোলেশনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সরাসরি অন্য ব্যক্তিতে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে, যা স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন তৈরি করে। বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের জন্য কোনো কার্যকর চিকিৎসা বা টিকা নেই।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, নিপাহ ভাইরাস এখন আর শুধু শীতকাল বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সারা বছরজুড়ে বহুমুখী সংক্রমণের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। সতর্কতার অংশ হিসেবে তিনি খেজুরের কাঁচা রস পান না করা, অনলাইনে রস না কেনা এবং আধা-খাওয়া ফল এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, খেজুরের রস খাওয়ার পর কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের সংক্রামক রোগ বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ও নিপাহ ভাইরাস জরিপ সমন্বয়কারী ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার জানান, ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তিত সংক্রমণধারা বিবেচনায় নিয়ে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই এখন সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এমটিআই

আপনার মতামত লিখুন :