ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬,
স্কুল পড়ুয়া ২ বন্ধুকে সাথে নিয়ে নিজের বাড়িতে নিজেই ডাকাতি

রূপগঞ্জে অনলাইন জুয়ার টাকা যোগাতে ডাকাতির নাটক, গ্রেফতার ৩ কিশোর !

পরিবর্তনের ডাক

ডিসেম্বর ৬, ২০২৫, ১০:০৫ পিএম

রূপগঞ্জে অনলাইন জুয়ার টাকা যোগাতে ডাকাতির নাটক,  গ্রেফতার ৩ কিশোর !

নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভায় দিনদুপুরে বাড়িতে ঢুকে শিক্ষার্থীর হাত-পা বেঁধে নগদ ১০ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ডাকাতির নাটকীয় ঘটনায় এলাকায় রীতিমত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায়দিনই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন-পৌরসভায় ডাকাতির ঘটনা জনসাধারণকে আতংকিত করে তুলেছে। তবে, কাঞ্চন এলাকায় দিনদুপুরে ডাকাতির বিস্ময়কর এক ঘটনার রহস্য উম্মেচনে বেড়িয়ে এলো থলের বেড়াল। নিজের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনার মাস্টারমাইন্ড নিজের ছেলেই, পুলিশের দেয়া এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যে রীতিমত অবাক করে দিয়েছে এলাকাবাসীকে। কিন্তু কেন এমন নাটকীয় ডাকাতির ঘটনা, এ প্রশ্ন এখন সবার ! শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ স্থানীয় স্কুল পড়ুয়া ৩ বন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ডাকাতি হওয়া নগদ ২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ও ২ ভরি স্বর্ণালংকার। ঘটনায় জড়িত ৩ শিক্ষার্থীরকে গ্রেফতারের পর তাদের জবানবন্দিতে বেড়িয়ে আসে ঘটনার মূল রহস্য। নতুন মোবাইল কেনার টাকা আর মোবাইল দিয়ে ফ্রি ফায়ার গেইম খেলার খরচ মেটাতেই ডাকাতির অভিনব এই পদ্ধতি বেঁচে নেন স্কুল পড়ুয়া ৩ বন্ধু।

মামলা সূত্রে জানায়, গত ২৪ই নভেম্বর দুপুরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন এলাকায় দিনদুপুরে শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে ঘরে প্রবেশ করে ১০ ভড়ি স্বর্ণ ও ১০ লাখ নগদ টাকা লুটে নিয়েছে অজ্ঞাত ডাকাত দল। এমন অভিযোগের ১দিন পর  মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) দুপুরে কথিত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দায়েরের পর ঘটনার রহস্য উম্মোচনে তদন্তে নামে পুলিশ। ঘটনার এক মাত্র প্রত্যেক্ষদর্শী ও কথিত ভোক্তভোগী পরিবারের ছেলে শাহরিয়ার তমো তখন ঘটনার বর্ণণায় বলেন, তার পিতা আব্দুর রশিদ ভোলাবো ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ওমেদার হিসেবে কর্মরত আছেন। তার নানা বাড়ির ওয়ারিশ সূত্রে ১০ লাখ টাকা ও তার মায়ের ব্যবহৃত ১০ ভড়ি স্বর্ণ বাসায় ছিলো। ২৪ নভেম্বর সোমবার তার মা ও বোন হাসপাতালে থাকাকালীন বাড়িতে তমো একা থাকায় অজ্ঞাত ডাকাত দল পরিকল্পিতভাবে তাদের বাড়ির ৩ তলায় প্রবেশ করে। সেখানে কৌশলে তালা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে মুখোশ পড়া ৫ ডাকাত। তারা তমোকে একা পেয়ে হাত পা মুখ বেঁধে ঘরে থাকা নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটে চলে যায়। এ সময় ভুলে বাসার মোবাইল না নেয়ায় তার মাকে জানালে তমোর চাচা এসে উদ্ধার তাকে উদ্ধার করে। পরে ২৫ নভেম্বর মঙ্গলবার থানায় মামলা দায়ের করা হয়। আর ওই ঘটনায় গ্রেফতার হন বাদীর ছেলে ও মামলার তথাকথিত প্রত্যেক্ষদর্শী-ঘটনার মাস্টারমাইন্ড শাহরিয়ার তমো (৮ম শ্রেণী), তার বন্ধু নাবিল (৯ম শ্রেণী), শাহ আলম (৬ষ্ঠ শ্রেণী)। তারা সবাই স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষার্থী ও একই এলাকারবাসীন্দা।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, উপজেলার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষের বিশাল একটি অংশ ভার্চুয়াল জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ হলেও এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আশানুরূপ নয়। এতে কোন প্রকার জটিলতা ছাড়াই তরুণরা বাড়ি, রাস্তাঘাট, দোকানপাটসহ বিভিন্ন জায়গায় বসে অনায়াসেই খেলছে ক্রিকেট, ফুটবল, তিন পাত্তি, রামি, রঙের খেলা, এভিয়েটর গেম, আইপিএল বেটিং সহ নানা অনলাইন জুয়া। এক সময় নির্জন স্থানে আডালে জুয়াড়িদের দেখা মিললেও বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে মোবাইল ফোনেই চলছে জুয়া খেলা। অনলাইন জুয়ায় সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট ও রাতারাতি ধনী হয়ে যাওয়ার প্রলোভনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে চটকদার বিজ্ঞাপন। ফলে বুঝে না বুঝেই অনলাইন জোয়ার ফাঁদে পড়ছেন শিশু-কিশোর সহ নানা বয়সের মানুষজন। অনেকেই শুরু করে মজা করে, পরে সেই মজাই ভয়াবহ আসক্তিতে পরিণত হয়। জুয়ার অ্যাপগুলো এমনভাবে সাজানো থাকে, যার ফলে শুরুতে লাভ পাওয়া যায়। এতে কৃষক, তরুণ, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছেন মরণনেশা জুয়ায়। পড়ে ফেঁসে যাচ্ছেন তারা। জুয়ার খপ্পড়ে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, অনেকে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে সোনার সংসার ভাংছেন। আবার অনেকে ঋণে জড়জড়িত হয়ে আত্মহত্যার মত পথ চেঁছে নিচ্ছেন। তাছাড়া এই জুয়ার টাকা জোগাতে এলাকায় বাড়ছে চুরি-ছিন্তাই-ডাকাতি সহ নানা অপরাধ। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সম্প্রতি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া ৩ কিশোর বন্ধু। তরুণ সমাজকে ধংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হওয়ার পরামর্শ দেন বিশিষ্টজনেরা।

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ নভেম্বর দুপুরে আব্দুর রশিদের বাড়িতে তার ছেলে শাহরিয়ারের হাত-পা বেঁধে মারধর করে আলমারি ভেঙ্গে নগদ ১০ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগ এনে আব্দুর রশিদ বাদী হয়ে থানায় ডাকাতির মামলা করেন। শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তারকৃত শাহ আলম একটি নতুন মোবাইল কিনলে পরিবারের সন্দেহ হয়। টাকার উৎস জানতে চাইলে সে তার ২ বন্ধুকে সাথে নিয়ে নিজের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করে। পরে স্থানীয়রা তিনজনকে আটক করলে তারা ডাকাতির নাটক সাজানোর কথা স্বীকার করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিশোররা জানিয়েছে, নতুন মোবাইল এবং ফ্রি ফায়ার গেমস আইডি কেনার টাকার জন্যই তারা এই পরিকল্পনা করে এবং ডাকাতির ঘটনা সাজায়।

পরিবর্তনের ডাক

Link copied!